সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০৩:২৪ অপরাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English
১২টি মামলার আসামি মাদক ব্যবসা ছেড়ে মুরগির খামারে পথচলা
ঠাকুরগাঁও থেকে আনোয়ার হোসেন আকাশ / ১৫১ Time View
Update : সোমবার, ১৬ মে ২০২২

মাদক ব্যবসা ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা মাজেদ
ঠাকুরগাঁও জেলার সবাই তাকে ‘মাজেদ’ নামেই চেনেন। জেলা সদরের রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি। একসময় জেলার মানুষ তাকে নামকরা ‘মাদক ব্যবসায়ী’ হিসেবে চিনতো। সময়ের ব্যবধানে আগের পরিচয় পাল্টে তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তীব্র ইচ্ছাশক্তি থাকলে আর পরিশ্রম করে গেলে যে সফলতার দেখা মেলে তার বাস্তব উদাহরণ এ যুবক। ব্রয়লার খামার করে সফল তিনি।

অভাবের তাড়নায় একসময় ফেনসিডিল ব্যবসা শুরু করেন আব্দুল মাজেদ। নিজের পরিচিতি থাকায় এবং তার অবস্থান শহরের কাছে হওয়ায় খুব দ্রুতই ফেনসিডিল বিক্রি বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে জেলার সবচাইতে বড় মাদক বিক্রিতা বনে যান তিনি। তবে এ নিষিদ্ধ ব্যবসার কারণে মাদক মামলায় পড়তে হয় তাকে। ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মামলার সংখ্যা। এক পর্যায়ে মাজেদ ১২টি মামলার আসামি হয়ে যান।

মাজেদ একসময় বুঝতে পারেন নিষিদ্ধ এ ব্যবসা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা আয় হলেও মামলা চালাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সবসময় আতঙ্কে থাকা আর অশান্তির জীবন তাকে চরম অস্থিরতায় ফেলে দেয়। সমাজের মানুষও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করে। সমাজ থেকে অনেকটা একঘরে হয়ে পড়েন তিনি। তাই তিনি মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঝুলে থাকা ১২টি মাদক মামলা আর সমাজের অগ্রহণযোগ্যতা তার পিছুটান হয়ে দাঁড়ায়।

মাজেদ বলেন, ‘আমি মাদক ব্যবসার ছাড়তে চাইলেও পারছিলাম না। পরে একসময় আমাকে আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান (রায়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম) ডেকে পাঠান এবং এ নিষিদ্ধ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। আমি তার সিদ্ধান্তে সম্মান জানিয়ে আমার সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরি। তিনি প্রতিটি সমস্যায় তার সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসা ছেড়ে একটি ব্রয়লার মুরগির খামার দিয়ে পথচলা শুরু করি। ধন্যবাদ চেয়ারম্যান সাহেবকে।’

মাজেদকে আলোর পথে নিয়ে আনা রায়পুর ইউপির চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মাজেদের মাদক ব্যবসার কারণে আমাদের এলাকাটা মাদকের আখড়া হয়ে গিয়েছিল। ইউনিয়নের মানুষ এটা নিয়ে আমার কাছে বারবার অভিযোগ জানায়। তাই আমি ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মাদক কারবার নির্মুলের সিদ্ধান্ত নেই। আমি চাচ্ছিলাম মাজেদ এই নিষিদ্ধ ব্যবসা ছেড়ে ভালো পথে ফিরে আসুক। তাকে জেলে দিয়ে লাভ নেই। বের হয়ে আবার ব্যবসা শুরু করবে। তাছাড়া ছেলে হিসেবে সে বেশ ভদ্র ছিলো। তাই তাকে বুঝিয়ে ও সহযোগিতা করে একটি ব্রয়লার খামার শুরু করাই।’

রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সাদেকুল বলেন, ‘একসময় রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা এলাকার পরিচয় দিতে লজ্জা পেতো। মাদক এলাকা নামেই বেশি পরিচিত ছিল। আমাদের ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে পারতাম না। রায়পুর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব ফিরে যেতো। তবে এখন আমরা বেশ ভালো আছি, শান্তিতে আছি।’

ব্রয়লার খামারে সফলতার বিষয়ে মাজেদ বলেন, আমি প্রথমে একটি মুরগির ফার্মে ব্রয়লার পালনের প্রশিক্ষণ নিই। তারপর অল্প পুঁজি নিয়ে ছোটো করে খামার প্রকল্প শুরু করি। ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়িয়েছি। এখন আমার খামারে দেড় হাজার মুরগী পালন হচ্ছে।

মাজেদ বলেন, ‘এখনো আমার নামে পাঁচটি মাদক মামলা ঝুঁলে আছে। কয়দিন পরপর আদালতে হাজিরা আর উকিলের পেছনে টাকা খরচ আমার জন্য অনেক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোভাবে যদি মামলাগুলো থেকে রেহাই পাওয়া যায় আর সরকারিভাবে সহযোগিতা পাই তাহলে আমি ব্যবসা আরও প্রসার করতে পারবো। একইসঙ্গে অন্যান্য তরুণদের ব্রয়লার মুরগি পালনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাই। কারণ আমি চাই না আর কেউ আমার মতো ভুলপথে পা বাড়াক।’

মাজেদের প্রতিবেশী রোহান রাজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘একসময় মাজেদের কারণে সন্তানদের বিপথে যাওয়ার আতঙ্কে থাকতাম। মাজেদ থেকে দূরে রাখতাম। কিন্তু এখন আমাদের সন্তানদের সেই মাজেদকে দেখিয়েই অনুপ্রেরণা জাগাই। মাজেদ যদি তরুণদের নিয়ে কাজ করে তাহলে আমরা অবশ্যই অনেক উপকৃত হবো।’

ঠাকুরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তাহের সামসুজ্জামান বলেন, মাজেদের বিষয়টি শুনে বেশ ভালো লাগলো। তার জন্যে শুভ কামনা। তার সব ধরনের সহযোগিতায় ঠাকুরগাঁও উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ