বুধবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২২, ০২:২৭ পূর্বাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English
ধর্মান্ধ প্রেম (১ম খণ্ড)
সাহিত্য ডেস্ক / ৬১ Time View
Update : বুধবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২২

পড়শি, পৃথিবীতে ৪৩ হাজার ধর্ম আছে। প্রত্যেক ধর্মের বর্ণভেদ ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু প্রেমের ধর্ম এক। তার কোন জাত পাত নেই। নীলদা, আমার যদি ওপারে মাথা গুজাবার একটু টাই থাকতো, তবে এপার ছেড়ে ওপারে চলে যেতাম, সমস্ত বন্ধন চিহ্ন করে। যে বন্ধন ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে,দুটি সুকমল হ্নদয়ের বোধকে আলাদা করে দেয়। আমি মানতে পারিনা ঐসব ধর্মকে, যে ধর্ম জাত পাতের কথা বলে, আমি সেই ধর্মকে নিয়ে অহংকার বা গর্ববোধ করিনা। পৃথিবীতে এসেছি একা, যাব একা। এর মধ্যবর্তী সময়টা কেন গুপ্ত অবস্থায় নোতফার মনি হয়ে আবদ্ধ থাকবো? যিনি প্রেরণ করেছেন তিনি কি বলে দিয়েছেন কোন ভিন্ন ধর্মীকে ভালোবেসো না? নাকি তিনি তার সৃষ্টিকে ভুলে যাবেন? নাকি ধর্মের ভিত্তিতে তিনি সেদিন বিচার করবেন,? দুটি প্রশ্ন রেখে গেলাম পাঠকের কাছে।

পড়শি, দীর্ঘ ন মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন একটি রাষ্ট্র পেলো মানুষ। শেখ মুজিব দেশ চলাতে শুরু করলেন, বলিষ্ট একটি সংবিধান উপহার দিলেন দেশের মানুষকে। যে সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদ সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা স্থান পেয়েছিল। কোথায় সেই ধর্মনিরপেক্ষতা এখন? কোত্থেকে কোন এক মেজর এসে ক্ষমতা দখল করে কোনও কারণ নেই কিছু নেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে ঘাড় ধরে বিদেয় করে দিলেন। তার পদাঙ্ক অনুসবণ করে আরও এক সেনানায়ক একটি চরম অন্যায় করলেন সংশোধনের নামে সংবিধানের ৮ম সংশোধনে একটি কালসাপ ঢুকিয়ে দিলেন। হা কপাল! দেশের কপালে এই ছিল। বাংলার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান মুসলমান আমরা সবাই বাঙালী, এই গান গাওয়ার মত আর কোন মঞ্চ রইল না বুঝি।

১৯৮৮ সালে ৭ জুন বাংলার ইতিহাসে একটি কালি মাখা দিন। চমৎকার একটি অসম্প্রদায়িক সমাজগড়ার সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে দিল সেদিন। অনেকটা সামনে এসে বিস্তর অজর্ন করে পেছনে শূন্যতার দিকে ফেরার দিন এখন। অসত্য অন্যায় অবিচার আর অন্ধকারের দিকে ফেরার সময়। এক দুই বছর পেছনে নয়, হাজার বছর পিছিয়ে দিয়েছে এই রাষ্ট্রধর্ম। এই যুগে ধর্মই সমাজে মুলমন্ত্র, এখানে বাক ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে মানুষের বিবেক। ধর্ম নামের কালব্যধির যে জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এতে ভীষন রকম আক্রান্ত হতে যাচ্ছে মানুষ।

ধর্মপ্রানকে মেরে ধর্মান্ধতা রুপ নিচ্ছে সমাজ। সেই সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ প্রেম কি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে? দেখো না, ধর্মভীরু মানুষগুলো কিভাবে জোট বেঁধেছে, একটি অসাম্প্রদায়িক প্রেমকে ঝেটিয়ে বিদেয় করতে সমাজ থেকে। মানুষের সম্প্রীতির মিলন কি ভালো লাগে তাদের। তোমার আর সুহ্নদের প্রেম তোমাদের মনকে ছুতে না পারলেও সমাজ ধর্মকে ছুঁয়েছে বিষণ। তা না হলে কেউ কি এত শীঘ্র ভুলে যেতে পারে তার সবচেয়ে আপন মানুষটিকে। সুহ্নদ কিছুতেই এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইনি। এ সমাজ বাধ্য করেছে চলে যেতে। তাকে মেরে ফেলবে এই ধর্মান্ধ সমাজ, সেই ভয়ে পালিয়ে গেছে। সে জানতো তার ভালবাসা কোনদিন সফল হবেনা, সফল হতে দেবেনা ওরা। তুমি দীর্ঘ দীর্ঘ দিন সুহ্নদহীন, একা পড়ে আছো, একা থাকার কোন প্রাণ থাকেনা, দীর্ঘ দীর্ঘ দিন দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনি আমি তোমার মাঝে। সুহ্নদের ওপর সমাজের অত্যাচারের কারণ একটিই, সেটি হল সুহ্নদকে তুমি ভালবাসো কেন? সে তো ভিন্ন ধর্মী, তাই তোমার কাছ থেকে সুহ্নদকে দুরে সরিয়ে দিয়েছে এই সমাজ, কারণ তুমি মুসলিম। এই হিন্দু মুসলিমের কারণে ১৯৪৭ শে দেশটা ভাগ হয়েছে। কত দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়েছে, তবুও কি ধর্মকে সংস্কার করেছে? পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে ততদিন ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ হিংসাত্বক হয়ে উঠবে। কিন্তু কোনদিন কি এই মানুষের মিলন মেলা হবে? মানুষ মানুষকে ভালবাসবে?
সুহ্নদ যে রাতে চলে যায়, সেই গভীর রাতে আমার দরজায় কড়া নাড়ে, আমি যখন জিজ্ঞেস করি কে? চুপি চুপি বলে আমি সুহ্নদ। আমি তড়িগড়ি করে দরজাটা খুলে দেখি তার ডান হাতে একটি ডায়েরি, সম্ভবত তোমার দেয়া উপহার, আর অন্য হাত দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে চোখ মুচছে। সুহ্নদের অমন কান্না দেখে বুক ফেটে যাচ্ছিল আমার। আয় আয় ঘরের ভেতরে আয়। কি হয়েছে তোর, অমন করে কাঁদছিস কেন? সে তো নিরব, চোখ দুটো টলমল করছে, অঝোরে ঝরে পড়ছে নোনা জল দুটি গাল বেয়ে। আমি শান্তনা দিয়ে বলি খুলে বল কি হয়েছে। তখন শুনি তোমাদের প্রেমের জল কতদুর পযর্ন্ত গড়িয়েছে। সুহ্নদ ভয়ে কেঁপে আমায় আকড়ে ধরে সেদিন কানে কানে শুধু বলেছে, আমি চলে যাচ্ছি ওপারে, পড়শিকে দেখিস। সেদিন আমি বুঝেছি সুহ্নদের জন্য এই সমাজ কতটা রণচন্ডীরুপ বিভীষিকা ছাড়া, ভয়ংকর ত্রাস ছাড়া কিছু নয়। এই দুনিয়ার কেউ আমার আপন নয়, তুই ছাড়া। তাই তোর কাছেই বলে যেতে এতরাতে এসেছি। আমি ফ্যালফ্যাল করে সুহ্নদের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ওঠি, সুহ্নদের চলে যাওয়া আমাকে ব্যথিত করে, একবুক ঘৃনা জন্মে এই অসভ্য সমাজের বুকে। খুন করতে ইচ্ছে হয় ধর্মটাকে, কিন্তু তখন আমি নিরুপায়, আমার কিছুই করার ছিলনা। চারদিকে শুনি সুহ্নদের শত্রুর হাসি বানরের যত দাঁত কেচামেচি।

মাঝখানে আমি একা, কি করে তাকে ধরে রাখি, আমার ব্যর্থতা সেদিন সাড়া বাড়ী পাড়াশুদ্ধ কাঁপিয়ে তুলেছিল। আমি যদি সেদিন সীমান্ত পাড় করে না দেই হয়তো এই ধর্মান্ধ সমাজ সুহ্নদকে মেরে ফেলতো। সুহ্নদের অপরাধ একটি মুসলিম মেয়েকে কেন ভালবাসলো? কত বড় অধর্মের কাজটি করে ফেললো সুহ্নদ; তার দায়ে পালাতে হল আজ। যে ধর্ম দুটি হ্নদয়কে আলাদা করে দিল,সেই ধর্মকে আমি মানিনা। যে ধর্মের কারণে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু সুহ্নদের বুক ছিঁড়ে টুকরো করে দিল, সেই ধর্ম সমাজকে আমি মানিনা। শব্দহীন আর্তনাদে সেদিন সুহ্নদ চলে গেল এ দেশ ছেড়ে। পরে শুনেছি আড়ালে গিয়েও খুব কেঁদেছে । কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না কিছুই। আমি ক্ষীন কন্ঠে মৃদু প্রতিবাদ করলেও সমাজ তার শুধ নিয়েছে সুহ্নদকে তাড়িয়ে। এই তো কিছুদিন আগে তার স্বপরিবারে চলে গেছে ওপারে, কত অপমান কত অসম্মান দূর্ভোগ পোহিয়ে এ দেশ ছেড়ে গেছে। কেউ কি তার খবর রেখেছে, রাখেনি। রাখবে কেন, সে তো ভিন্ন ধর্মী লোক, কার কি আসে যায়। এই সমাজ যদি চাইতো সুহ্নদকে কুচিকুচি করে কাটবে তবে কাটতো। সেই সমাজের এমন আচরণের বিরুদ্ধে যেতে কার বা সাধ্য আছে। আমিও মুখ বুজে থাকি ধর্ম নামক বাঘে দৌড়ানো লুকানো হরিণের মত। কিন্তু তুমিও যে দেখছি এখন হাসতে ভুলে গেছো, কাঁদতে শিখেছো খুব, কথা বলো মিনমিন করে, এমন শব্দহীন স্বর,শঙ্কিত পদক্ষেপ, নিষ্প্রভ, নিরুতেজ থাকো, অমন ঘরবন্দী জীবন ভালো লাগে কী? কেন সারা মুখে ভয়ের কারন? কেন আজও ভয়ে পাথর হয়ে থাকো? একটু স্বস্তি আনো মনে, একটু সাহসে উঠে দাড়াও এই কঠিন বিরুপ সমাজের বুকে, তুমি উঠে দাড়ালে আগামীর স্বপ্নবোনা সহজ হবে।

মানুষকে মানুষ ভালো বাসবেই, মানুষের প্রেমে মানুষ পড়বেই, তা না হলে এই পৃথিবীতে আসা কেন? এখনো যেহেতু আছো অপেক্ষামান, তবে শুরু করে দাও এই ঘুণেধরা সমাজটাকে বদলাতে কিছুটা দায়িত্ব নাও। তোমার এমন দুঃসহ অবস্থা দেখে প্রতিবারই আমি এক বুক কষ্ট আর হতাশা নিয়ে ঘরে ফিরি। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে কোন সভ্য মানুষ বাচতে পারেনা। সুহ্নদের ওপর যে অত্যাচার করেছে সমাজ, করুক, তবে আর কোন সুহ্নদের ওপর যেন এমন অত্যাচার না হয়, চলো সেই পথে হাটি। এমন নিষ্টুরতা সহ্য করা যাবেনা আর। আমাদের সমস্ত আবেগ সমস্ত স্বাভাবিক প্রকাশ ও শক্তি দিয়ে চেপে রেখে উঠতে হবে, ঐসব কৃতিমতাকে গলা টিপে হত্যা করে চলো স্বপ্ন দেখি আগামীর শিশুদের অনাবিল বোধের, মানুষের মৌলিক বিশ্বাসের, চলো রুখে দাড়াই ঐসব সভ্যেতার অবিকল ক্ষতির বিরুদ্ধে- আত্ম মরণের ক্লেদ, ক্ষমাহীন অক্ষমতা, ছিঁড়ে ফেলি অচেতন বোধ, রক্তাক্ত করি চাবুকে মানুষের মৌলিক মুখোশ। আর যেন মানুষের সৌরভ বোধের নিবেদিত সকাল ধর্মের আগুনে না পোড়ে। সুহ্নদের বন্ধু নীলদা, পড়শিকে নিয়ে সুহ্নদের চলে যাওয়া ধুলির ওপর দাড়িয়ে দীর্ঘক্ষন সময় কাটাতে থাকে, কথা বলে, তর্ক করে, অভিমান করে, রাগ করে, কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায় আর আগামীর সম্ভাবনা কতদুর কোথায়?

পড়শি, এতক্ষন চুপ করে নীলের কথা শুনে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার প্রতিত্তরে আসলে নীল ধর্মের সামনে আমরা সকলি মাথা নত করি, যেহেতু মানুষ ধর্মভীরু তাই ধর্মকে ব্যবহার করে আমরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, কোন অনৈতিক কাজকেও বৈধতা দিতে পারি। এই ধর্মের বাহিরে আমরা কেউ যেতে পারিনা, এটা এমন একটি বৃত্ত, এর ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছি। আর এই বৃত্তের বাহিরে যে গেছে সে হয়তো মহা মানব, নইতো সমাজ থেকে বিতাড়িত। এই ধর্মতন্ত্রটা এত কঠিন একটা বিষয়, যাকে নিয়ে ভাবলে ও গা শিউরে ওঠে। তাই এর বিরুদ্ধে কেউ যেতে চায় না। এই ধর্মটাকে মনে করে জ্যান্ত একটা ভয়কর প্রানী, যাকে ত্যাগ করলে বুঝি জাত কুল সবি গেল। যেন তার বিরুদ্ধে গেলে জ্যান্ত গিলে খাবে, এমন বিযয় হয়ে সামনে দাড়ায়। এই ধর্মটাকে এত ভয় পায় কেন মানুষ। আসলে ভয় পাওয়ার যতেষ্ট কারনও আছে, সবকটি ধর্মের ভেতর দুটো চমক আছে, একটি স্বর্গ অন্যটি নরক। এই স্বর্গ নরক শব্দ দুটো মানুষকে বশে আনার কৌশল। যদি তুমি ধর্মের পথে চলো তবে তোমার জন্য স্বর্গ, আর তুমি যদি সেই পথে না চলো তাহলে নরক। এই স্বর্গ নরক তো আমরাই তৈরি করি। আমরা যদি একে অপরকে ভালোবাসি, সম্মান করি সেখানেই তো স্বর্গ রচনা করতে পারি, আর যদি আমরা একে অপরকে ঘৃনা হিংসা বিদ্বেষ কাউকে ভালো না বাসি সেখানে তো নরক দেখতে হবেই।

এটাই তো স্বাভাবিক। কেন তবে এই ইহলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারছিনা, পরকালের প্রত্যাশায় কেন মানুষ মানুষকে ঘৃনা করে, হত্যা করে, বিতাড়িত করে? কেন ভিন্ন ধর্মালম্বীকে অত্যাচার নির্যাতন করি, কেন তারে গ্রাম ছাড়া দেশ ছাড়া করি, চোখের সামনে এত অন্যায় অনৈতিক দেখেও চুপ থাকি, কোন প্রতিবাদ করি না, অদৃশ্য ঈশ্বরের নামে ঐসব অনাচার অত্যাচার জায়েজ করি, এইসব কি অন্ধতা মূর্খতা নয়? আচ্ছা নীল বলো তো, কতদূর কোথায় ঈশ্বর, এক অজানা শক্তির নামে কত রক্তপাত কত নির্মম ঝড় তুলি। কোন সেই স্বর্গের হুর আর শরাব পাওয়ার আশায় মানুষ এমন করে, যার লোভে মানুষ হয়ে যায় পশুর অধম। পৃথিবীর ভালো বাসা ভুলে মত্ত থাকে, চলোর ঐসব নোংড়ামী ভুলে আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে, দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায়, আগামীর স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাই সমতার বীজ। তুমি বলতে না একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিল আলো, আজ তার কঙ্কালের হাড় আর পচা মাংস গুলো ফেরি করে ফেরে কিছু স্বার্থন্বেষী ফাউল মানুষেরা।ধর্ম কোনও আলো এনেছিল কোনও কালে, আজ থেকে সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ণ করে গাল গল্পে মজে যারা তাদের থেকে দুরে সরি, মনে রেখো নীল, আমি ধর্মান্ধ নই ধর্মপ্রান একজন মানুষ। যে ধর্ম অন্ধকার ছাড়া আর কিছু পৃথিবীতে ছঠায়নি, তাকে সম্মান করবো আমি, প্রশ্নই উঠে না। মানুষের অজ্ঞানতা থেকে আর মৃত্যুভয় থেকে জন্ম নিয়েছে এই ধর্ম। একেশ্বরবাদী এই মানুষেরা ধর্ম তৈরি করেছে তাদের আনন্দের জন্য, ইহলৌকিক সুখ ভোগের জন্য। ইসলামের ইতিহাস বলে আরবের লোকেরা গুহায় বাস করত, কন্যা জন্ম দিলে জীবন্ত কবর দিত, আর সেই দুরবস্থার অবসান ঘটিয়েছেন নবী মোহাম্মদ।

আগে মেয়েরা বাণিজ্য করত, যুদ্ধে যেত, নিজের পছন্দ মত বিয়ে করত, তালাকও দিত, তখন কি এমন জঘন্য ধর্ম ছিল, ভিন্ন গোত্রের লোকদের রক্তে স্নান করড, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করত, বিতাড়িত করত অন্য ধর্মের মানুষকে ভালবাসলে, এই ধর্ম কখনও আধ্যাত্ত্বিক ব্যাপার ছিল কি? ছিল প্রথম থেকে শেষ অবদি রাজনৈতিক। এই রাজনৈতিক দোহাই ধোকা থেকে মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে হবে সুন্দরের, যেমন দেখিয়ে ছিলেন রাজা রাম মোহন রায়, তিনি বুঝেছিলেন এর পেছনে আর কিছু না, আছে শুধু রাজনৈতিক খেলা। এই খেলার ওপর নির্ভর করে সকল অন্যায়কে নিরবে মেনে নেই, এটা কি আরেকটা অন্যায় নয়? তোমাকে কথা দিলাম, সে-কালকে সুন্দর করতে যদি স্বর্গ লাভের ইচ্ছে হয়, তবে প্রথমেই নরকের উপকরন গুলোকে সরাতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে পৃথিবীর এমন জঞ্জালগুলোকে, যারা ধর্মের নামে, অবিচারে লিপ্ত থাকে, সুন্দর ভাবনাকে অসুন্দরে পরিনত করে, মানুষের স্বপ্নের পৃথিবীকে দ্বিখন্ডিত করে, এর চেয়ে বড় দোযক আর কি হতে পারে? এরাই তো স্বর্গকে নরকে পরিনত করে, আগে এদেরকে মানুষে পরিনত করতে হবে। এই অনৈতিক ধর্মান্ধরা যত দিন মানুষ না হবে, ততদিন ধর্মের মর্যাদা লাভ করতে পারবে না, আর ধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্টা না হলে মানুষ ধার্মীকও হতে পারবে না। আর একজন সত্যিকারের ধর্মপ্রাণ মানুষ কখনও কারো ক্ষতি করতে পারেনা। কারণ সে জানে, কারো ক্ষতি করলে স্বর্গ লাভ করতে পারবে না, তার অন্তর কেঁপে উঠবে।

মানুষ স্বর্গলাভের প্রত্যাশায় কত কিছুই না ত্যাগ করে, এই ত্যাগ যে স্বিকার করে না-সেই নরকের কীট। এই কিটেরা সমাজ, রাষ্ট্র এমন কি বিশ্বকেও নরকে টানে। এই অসভ্যরাই দিনকে দিন পৃথিবীকে পেছনে টানে, অশান্ত করে তুলে, এদেরকে চরম ঘৃনা করা উচিত। চলো আমরা একটি মানবিক পৃথিবী বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি, আজ থেকে আমাদের কথা হোক পৃথিবীর যেখানেই এমন নিপীরণের স্বীকার হবে, বঞ্চিত হবে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াবো, এভাবেই এগিয়ে যাবো সুন্দরের পথে, ঐসব অন্যায় অবিচার রুখে দিয়ে মানুষের বুকের ঘুমন্ত পশুটাকে হত্যা করে জাগিয়ে তুলে সুকুমার বোধগুলোকে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিয়ে আগামীর স্বপ্ন দেখাতে হবে। এই কল্পিত নরকের বুকে আমাদের স্বর্গ রচনা করতে হবে, তবেই মানুষ মানুষকে ভালবাসবে, হাসবে গাইবে খেলবে, যেখানে মানুষ বেচে থাকবে মানুষের পরিচয়ে, ধর্ম নামের কালসাপকে মানুষ ভালবেসে খুন করবে, বিতাড়িত করবে মানুষের পৃথিবী থেকে। প্রিয় সুহ্নদ, তোমাকে কাছে নাইবা পেলাম, তুমি দুর থেকে দেখো, তোমার ছিলাম, তোমারি আছি, থাকবো চিরকাল।

তুমি শুধু ওপার থেকে দেখো, তোমার ভালবাসা জোনাকির মত কেমন টিমটিম করে জ্বলে জ্বলে আলোয় আলোয় আলোকিত করে এই পৃথিবীকে। তুমি এক জীবনে নাইবা পেলে আমায়, হাজার জীবন যদি পায় সুখ তোমাকে ভেবে, সেই পথ রচনা করে যাবো আমি। আমাদের প্রেম সে পথে অম্লান হয়ে রবে, আমাদের ছোট ছোট দুঃখগুলো সেদিন বড় বড় সুখে পরিনত হবে। ক্ষত দুটি জীবনের বিনিময়ে হাজার জীবন প্রগতির পথে হাটবে, তুমি সেই পথে বসে হাসবে, তোমার হাসিতে সেদিন এই ভালবাসা পূর্ণতা পাবে। পড়শি, তোমার এই চিন্তা চেতনা মেধা মননকে আমি স্যালুট জানাই। যুগে যুগেই সুন্দরের ভাবনায় এগিয়ে এসেছে এমন স্বপ্নবান মানুষেরা। তুমি সেই তাদের মাঝে একজন চিন্তাশীল মানিষ। তোমার এই প্রেম তোমাকে জাগিয়ে তুলেছে। স্বার্থক জনম তোমার, তোমার চোখে আগুন জ্বলে, তুমি পারবে অসুন্দরকে পোড়াতে, নীল চলে গেছে ওপারে, তাতে কি, আমি ত আছি তোমার পাশে,আমি তো হিন্দু নই, সজাতী। ছায়ার মত পাশে থাকবো। তুমি যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করবে। কারো অনুগ্রহের প্রয়োজন নেই। শত শকুনের বুকে বারুদের মত জ্বলে উঠো না, নিভে যাবে অচিরেই, তাই ধীরে ধীরে জ্বলে উঠো, নিভে যাওয়ার ভয় থাকবে না তাতে। জানো, সুহ্নদ চলে যাওয়ার পর থেকে একটি স্বপ্ন আমাকে তাড়া করে ফেরে, মানুষে মানুষের সেতুবন্ধন। আমি আর সুহ্নদ তো ছিলাম একই জল হাওয়ার মানুষ, একই ভুখন্ডের, একই দেশে জন্মেও অধিকার পেলো না বসবাসের, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেল, যেতে বাধ্য হল।

হিন্দু বলে তাকে অপমান অবিচার করে তাড়িয়ে দিল সপরিবারে। আচ্ছা পড়শি, এ দেশে হিন্দু হয়ে জন্ম নেওয়া কি পাপ? হিনদুরা কেন মুসলিমকে ভালবাসতে পারেনা? কেন তাদের ভালবাসাটাকে এই সমাজ মেনে নিতে পারেনা? কেন ওরা জাতের বিচার করে? ধর্মের দোহাই দিয়ে ভালবাসাকে হত্যা করে? এটা কেমন ধর্ম পড়শি? আমার বুঝে আসেনা। তোমার চোখ খুলতে হবে পড়শি, এই ধর্মের গভীরে গিয়ে তত্ত্বকথা জানতে হবে পড়শি। তখনকার সময়ে হিন্দু নারীদের জ্যান্ত পুড়িয়ে সতীদাহে সতী হতে হত, সেই সময়ে রাজা রাম মোহন রায় অবতার হয়ে সেই সমাজের সাথে লড়াই করে এমন প্রথা উচ্ছেদ করেছিলেন আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে। তখন সময়ে তিনি যে কতটা হেনস্থা হয়েছিলেন এই সমাজের কাছে ইতিহাস তা প্রমাণ করে। আসলে কি জানো, প্রতিটা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যারা বসে আছেন, মূলত তারাই চায়না একটি স্যাকুলার রাষ্ট্র জন্ম হোক। এখানেই আমার দুঃখটা। যেদিন তোমার আমার মত লোক ঐস্থানটিতে যেতে পারবে হয়তো সেদিন ধর্মের কিছুটা পরিবর্তন আসতেও পারে। কিন্তু যিনারা শীর্ষাসনে আসীন তিনারা যদি অন্তরে কোষে কোষান্তরে ধর্মের গোঁড়ামী লালন করে থাকেন তাহলে হাজার শিক্ষিত দিয়ে কি হবে। যদি না গোড়ায় গলদ থাকে। আচ্ছা নীল, তুমি একটা কাজ করো, তুমি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে যা! কেমনে? নির্বাচন করে। হাসালে! হাসির কি হল; আমাকে কেউ ভোট দিবে, কেন দেবে না?

আরে বোকা! যুগে যুগে তারাই ক্ষমতায় যায়, যারা এই সমাজের প্রচলিত প্রথার সাথে সাথে ইয়েস বলতে পারে। আমি কি তা পারবো। এই আমারি মত কত নিবেদিত মানুষেরা নিরবে নিবৃত্তে ঝরে যায়, কেউ তার খবর রাখেনা। এই ঝরে যাওয়া মানুষেরা যেটুকু স্বপ্ন দেখে, তার কিছু না কিছু রেখে গেছে মাটির এই পৃথিবীর বুকে, সেই রেখে যাওয়া স্বপ্ন আমাদেরকে আজও অনুপ্রাণীত করে, প্রেরনা যোগায় এগিয়ে যেতে। এই এগিয়ে নেওয়ার মানুষ বড় অভাব আজ। তারা সংখ্যায় কম। আমাদের দায়িত্ব সংখ্যা বাড়ানো, আমি সংখ্যা বাড়ার শব্দ শুনতে পাই, এই মেজরিটি আর মাইনেরিটির অবসান হোক। আমি সংখ্যালঘু আর সংখ্যাঘরিষ্টতার আড়ষ্টতা ভাঙতে চাই। সমতার প্রশ্নে বিদ্ধ করতে চাই মানুষের বিবেক। আমাকে তুমি সাহায্য করো, তোমার হাতটি আমার খুব প্রয়োজন। সবাই পারেনা, যে হাতটটি আমি তোমার মাঝে দেখেছি, আমি সুহ্নদকে হারিয়ে তোমাকে বন্ধু ভেবে নিয়েছি। কিছুদিন আগে সুহ্নদ আমাকে ফোন করেছিল, আমরা এ বিষয়ে অনেক কথা বলেছি, উত্তর দক্ষিন পূর্ব পশ্চিম নিয়ে। আমাদের কথার ঝড় উঠেছিল। আচ্ছা নীলদা, আমার কথা কিছু বলেনি- বলেছে। কি বলেছে? শুধু বলেছে কেমন আছো তুমি? তুমি কি বলেছো? বলেছি- যেমন রেখে গেছো। আর কিছু বলেনি, বলেছে। কি বলেছে? কত কথা! ও। ওপারে কেমন আছে সে? বেশ আছে। থাক্। ও ভালো থাকলে আমি ভালো থাকি। জানো পড়শি, সুহ্নদ আরেকটি কথা বলেছে, কি কথা? না থাক্, আরে বলোনা, না বলবো না। আমার ওপর রেখে আছে বুঝি? রাগ তো সে করতেই পারে। রাগ করার যতেষ্ট কারণও আছে। তোমাকে কি তার সাথে যেতে বলেছিল? না। তাহলে রাগ করবে কেন। আর রাগ যদি তার থেকেই থাকে, তবে তারই রাগ সমাজের ওপর, ধর্মের ওপর, তোমার ওপর কেন হবে। হতেও তো পারে, কারণ আমাকে ভালবাসার দায়ে এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে হল। নীলদা, শেষের কথাটি কি বলেছিল? আরেকবার আসবে সে এপারে। কেন আসবে? তার ভিটে মাটিটুকু বিক্রি করতে। প্রশ্নই উঠেনা। আমি তা হতে দেবো না। কেন দেবে না? কারণ সে এ দেশের সন্তান,এ দেশে জন্ম নিয়েছে সে, কার ভয়ে সব বিক্রি করে দেবে? সে এখানেই থাকবে, তার থাকার অধিকার আছে। সে এ দেশের নাগরিক, কোন রাষ্ট্রহীন নয়।কেন অন্য ভূখন্ডে আশ্রয় হয়ে থাকবে? নীলদা, তুমি বলে দিও, সে যেনো এমন ঘৃনিত কাজটি না করে, এই নিন্দ সমাজের ভয়ে। চলে গেছে ভালো কথা, ফিরে আসবে একদিন, তার এই ভিটে মাটি আমি পাহাড়া দেবো প্রহরী হয়ে, যতদিন না সে ফিরে আসবে ততদিন। তাকে এও বলে দিও ৪৭,৭১,৯০ এর দাঙ্গা ভুলে যেতে। তার ভয়ে যদি পলাতক জীবনকে স্বস্তির মনে করে তবে সে কাপুরুষ, মানুষ নয় প্রেমিকও নয়।

আমি ধরে নেবো আমার ভালবাসাকে অপমান করে পালিয়েছে সে। আমার প্রেমকে যদি এ লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে চায় তবে যেনো তার ভিটেমাটি বিক্রি না করে।

লেখক: পঞ্চভূত (ছদ্মনাম)

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category