মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ১১:০১ অপরাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English
স্বাধীনতার ৫১ বছরেও অবহেলিত শ্রমিকরা
মোঃ আবুল কালাম / ৬১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২

আজ পয়লা মে৷ মহান শ্রমিক দিবস৷ ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকেরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওই দিন তাঁদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পর থেকে দিনটি ‘মে দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও এ দিনটি গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়৷ কিন্তু স্বাধীনতার এই ৫১ বছরে এসেও শ্রমিকদের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে সে প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়৷ এখনো হরহামেশাই শোনা যায় শ্রমিকদের আর্তনাদের কথা৷ নারীদের যৌন হয়রানির কথা। বেতন বোনাসের দাবিতে রাস্তা অবরোধের কথা। বাংলাদেশের শ্রমিদের জীবন মান, নারীদের সুরক্ষা, বেতন ভাতা নিয়ে গড়িমসি থেকে পরিত্রানের পথসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা৷ তাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন মোঃ আবুল কালাম৷

এখনো অবহেলিত হচ্ছে শ্রমিকরা
প্রফেসর সাজ্জাদ হোসেন,
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আমরা জানি যে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। এটা অবশ্যই আমাদের গৌরব এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে শ্রমিকদের জীবনমান অতীতের তুলনায় বর্তমানে অনেক উন্নয়ন হয়েছে তবুও শ্রমিকদের আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। শ্রমিকরা সবসময় নিষ্পেষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত এবং তারা যথাযথ ভাবে তাদের শ্রমের মূল্যায়ন পায়না। আমরা জানি যে, ১৮৮৬ সালে শিকাগো শহরে শ্রমিকদের এক বিশাল আন্দোলন হয়৷ শ্রমিকদের ২০ ঘন্টা কাজের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনে অনেকে কর্মী নিহত হন৷ আহতদের সংখ্যাও কম নয়। তাদের আন্দোলনে ফলশ্রুতিতে বর্তমান শ্রমিকরা নিয়মিত ৮ ঘন্টা কাজ করে।

শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য মালিকপক্ষ বিশেষ করে সরকার তাদেরকে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের অনেক মেধাবী মানুষ তারা বিদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাদের শ্রম এর যথাযথ মূল্যায়ন না করার জন্য। বাংলাদেশকে এখনই ভাবতে হবে শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্মান করা। অতীতের চেয়ে বর্তমানে শ্রমিকদের মূল্যায়ন কোন অংশেই কম না। গ্রামে গঞ্জে বর্তমানে কাজের মূল্যায়ন অনেক বেশি আগে যেখানে শ্রমিক ২ কেজি চাল কিনতে পারতো একদিন শ্রমের বিনিময়ে সেখানে বর্তমানের শ্রমিকরা ১০ কেজি চাল কিনতে পারে।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন এগিয়ে যেতে পারে শ্রমিকদের মান উন্নয়ন শ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষায় কাজ করতে হবে। শ্রমিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, সেক্ষেত্রে দেখা যায় কাজে কোন শ্রমিক যদি অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা জনিত কারণে আহত বা নিহত হয়, সেক্ষেত্রে যে মূল্যায়ন করা হয় সেটা খুবই নগণ্য।

আহত বা নিহতের পরিবারকে এমন ভাবে সাহায্য করা প্রয়োজন যাতে তার পরিবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। এই বিষয়ে মালিক পক্ষের সুদৃষ্টি এবং সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে যাতে করে শ্রমিকের জীবন মান উন্নয়ন এবং শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা হয়।

শ্রমিকদের বেতন ভাতার সচ্ছতা আনতে হবে
জামশেদুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বাংলাদেশে বেসরকারি যে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে তাদের উপর সরকারি হস্তক্ষেপ এবং তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশে যে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে তারা তাদের ইচ্ছে মতন বেতন বোনাস দিচ্ছে আবার অনেক সময় তাদের ন্যয্য পাওনা আটকিয়ে দিচ্ছে। সরকার বিশেষ ভাবে নজর দিতে হবে যাতে কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের অর্থ নিশ্চিত হয় প্রয়োজনে সরকারকে নীতিমালা তৈরি করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন বোনাস বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রের সুন্দর, সুষ্ঠ ভাবে পরিচালনা করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না।

সরকারি ভাবে সুষম বণ্টন বা সুষম সেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে বিশেষ ভাবে সচেতন হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্রমবান্ধব হওয়া প্রয়োজন যাতে করে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা হয়। আমি দেখেছি বাংলাদেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক যদি কোন অসুবিধার কারণে কাজ না করতে পারে তাহলে তাকে নিয়ম অমান্য করে চাকরি থেকে অব্যহতি দিয়েছে। অনিবার্য কারণবশত কোন কর্মীকে চাকরীচ্যুত করা অন্যায় এটা এবং মানবিক দিক দিয়েও ঠিক না। বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যারা বেসরকারি চাকরি ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন হলে আলাদা মন্ত্রণালয় বা বোর্ড গঠন করে সুনির্দিষ্ট নজরদারি ও বেসরকারি শ্রমিকদের স্বার্থ করার জন্য বিশেষভাবে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

যদি কোন শ্রমিক কার্যকালে প্রাণহানি ঘটে বা অঙ্গহানি ঘটে তাহলে হয়তো তার অঙ্গ ফিরিয়ে দেয়া যাবে না কিন্তু তাকে যদি অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য করা এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কেউ কাজ করার সামর্থ্য থাকে তাহলে তার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি ভরণ পোষণ করে তাহলে মানুষ বেঁচে থাকার সুন্দর একটি উপায় পাবে। শ্রমিকরা যাতে তাদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

শিশুশ্রম মারাত্মক ভাবে ভাবিয়ে তুলছে
আনিসুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বর্তমান সময়ে যে কয়েকটা সমস্যা পুরো বিশ্বকে মারাত্মক ভাবে ভাবাচ্ছে, তার মধ্যে শিশুশ্রম অন্যতম। গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীর প্রতি ৬ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশুশ্রমিক। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। ৫ থেকে ১৫ বছরের এই শিশুদের ৪.৩ শতাংশ শিশু সরাসরি ভাবে শিশুশ্রমের সাথে সম্পৃক্ত। এদের প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু পরিবারের ভরণপোষণের জন্য গ্রাম থেকে শহরে এসে শিশুশ্রমে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই সকল শিশুরা শহরাঞ্চলে প্রায় ৩১০ ধরণের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রতিনিয়তই শ্রম দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ইউনিসেফের জরিপে প্রতীয়মান।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করা, ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে অনগ্রসর শিশুদের অনুকূলে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা, ৩৪ (১) অনুচ্ছেদে সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। এছাড়াও জাতীয় শিশু নীতি- ২০১১ অনুযায়ী ৫ থেকে ১৮ বছরের শিশুকে দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না এবং ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুকে কর্মে নিয়োগ দেওয়াকে দন্ডনীয় অপরাধ বলে উল্লেখ রয়েছে।

শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকলেও, তার বাস্তবায়ন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। শিশুশ্রম রোধ তথা নিরসন করার জন্য এই সকল আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এছাড়াও, অঞ্চল ভিত্তিক শিশুশ্রমের কারণ চিহ্নিতকরণ সাপেক্ষে বিভিন্ন পূর্নবাসন প্রকল্প গ্রহণ, প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু ভাতা প্রদান, স্বল্প, মধ্য, ও দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, গণমাধ্যমে শিশুশ্রম রোধে সচেতনতা প্রচার, এবং শিশুশ্রম নিয়োগকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি, শ্রম থেকে শিশুদের মুক্তি দিয়ে আলোকিত উন্নত আগামী বাংলাদেশ গড়ার জন্য সরকারী ও বেসরকারী সকল শ্রেণীর মানুষের ঐক্যবদ্ধ আকুন্ঠ সমর্থন ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা আবশ্যক।

আইনের যথাযথ কার্যকর করতে হবে
রাবেয়া সরকার
সহকারী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

যদি কোন নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সেক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। যৌন হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা এবং কাউন্সিলিং এর বিশেষ প্রয়োজন। যেহেতু বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে শতকরা ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করেন। অন্য অন্য নারী পুরুষ কম বেশি থাকলেও গার্মেন্টস শিল্পে নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে যে যৌন নিপীড়ন হচ্ছে না তা নয়,প্রতিষ্ঠানের বাইরেও অনেক নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। সেক্ষত্রে কাউন্সিলিং বিশেষ জরুরি কারণ আমাদের যদি মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটে তাহলে কোন ভাবেই এই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।

যদি প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং এবং কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা এবং কাউন্সিলিং এর মধ্যে দিয়ে যদি মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে তাহলে নারীর কার্যক্ষেত্রে এবং কার্যক্ষেত্রের বাহিরেও অনেক অংশে যৌন নিপীড়ন কমে আসবে। যদি কোন নারী বাহিরে ছেলে দ্বারা যৌন নিপীড়ন শিকার হয় তাহলে এই দেশে যে আইন আছে সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে নারীদের সপক্ষে আইন সবচেয়ে বেশি, শুধুমাত্র বেশি আইন থাকলেই হবে না সেই আইনের যথাযথ কার্যকর করতে হবে।

যখন কোন নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হন তখন মেয়েরা অনেক অংশেই চুপ করে থাকে। তারা কোথায় অভিযোগ করবে সেটাও তাদের কাছে পরিষ্কার না। এই জন্য আমাদের দেশে যে সকল বেসরকারি সংস্থা আছে যারা নারীদের নিয়ে কাজ করে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি সংস্থার সাহায্যে পুলিশকে জানানো এবং পুলিশ যদি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে এবং সততার সঙ্গে বিষয়গুলো দেখে তাহলে অনেক অংশেই নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন কমে আসবে।

(মতামত কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই)

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

More News Of This Category
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ