শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:৪৯ অপরাহ্ন

  • বাংলা বাংলা English English
“ঘরে ফেরা”
ডেক্স / ৫৭ Time View
Update : শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২

আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা, তারপরেই আশ্বিনের মাঝামাঝি শুরু হবে বাজনা বাজি।

দূর্গা পূজার মত বহুমাত্রিকতা শুধু বাংলায় কেন?
পৃথিবীর যে কোনো উৎসবেই বিরল।
এর কত আঙ্গিক‌তা, কত আবহ, আর ঝকঝকে নীল আকাশ।
কাশফুলের মত মেঘ আর অপেক্ষামান- ঢাকিদের বোল।
এই সবকিছু মিলেই বাঙালির দুর্গাপূজোয় অন্তঃসলিলা ফুলগো‌ ধারার মতো তিল তিল করে বয়ে চলে। আরও একটা ভাবনা।
একটা বোধ‌।
এক মেয়ের দীর্ঘদিন পর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি ফেরা।
এক মায়ের-সন্তানের প্রতি যেমন আকুলতা মেয়েকে কাছে পাওয়ার আনন্দ।
এবং পক্ষান্তরে তাকে আবার বিদায় জানানোর বিষাদ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আমাদের বাংলাদেশের এক কঠিন অন্তর্বেদনা আছে।
মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো।
এই অন্তর্বেদনা বাংলার লৌকিক গল্প কিংবা কিংবদন্তিতেও স্পষ্ট।কুটুম পাখি আর ইষ্টি কুটুম পাখির গল্পটাই ধরুন না—
হলুদ শরীর কালোমাথা।
আর লাল চোখের এই পাখিকে- আমরা বেনে বউ অথবা বউ কথা কও বলে‌ চিনি।
কুটুম পাখি নাকি আসলেই ছিল ছোট্ট একটি মেয়ে। একদিন বাড়িতে কুটুম আসবে বলে- শরীরের জ্বর নিয়েও শাশুড়ির হুকুমে।
কঠোর পরিশ্রম করে রান্না করেছিল।
রান্না খেয়ে কুটুমরা খুব নিন্দা মন্দ করেছিল।
শাশুড়ি মা শেষ অব্দি প্রচুর বকাবকি করেছিল।
মেয়েটি চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু ভাবছিল মায়ের কথা। তারপরই নাকি তরকারির ঝোলেমাখা সারা শরীরটা হল হলুদ।
পুড়ে যাওয়ার জন্য মাথাটা হলো কুচকুচে কালো।
জ্বরের জন্য চোখ তো লাল ছিলই,
বাঙালি মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এই যে একটা কষ্ট,
আসংখ্যা ও
উদ্বেগের আবহ– তার কারণ অনুসন্ধান করলে-দৃশ্যমান হয়।
সমাজ ব্যবস্থা ছিল অন্ধকার ও ‌অনেক জটিল,অনেক দগদগে ক্ষত।
সতীদাহ,বাল্যবিবাহ, বহু বহুবিবাহ‌, গৌরিদান ও কুলিঙ্গ প্রথা।

জন্ম আমার হিন্দুর ঘরে বাপের বাড়িতে ছিলাম বছর দশেক খুব আদরে।
কুলীন পিতা ছিলেন বলে তুলে দিলেন বুড়ার গলে, হলাম পরের বশ।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখে গেছেন।
অন্নপূর্ণা বলছেন, পতি বড় বিত্ত- পতি শিল্পীতে নিপুণ।।
গুণগান নাহি তার কপালে আগুন।
উত্তরের পাতুন বলছেন—যেখানে কুলীন জাতি সেখানে কূ্ন্দল‌‌।
কাজেই অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা জানতেন‌ শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো মানেই মেয়েকে এক অনিশ্চিত আশঙ্কার দিকে ঠেলে ফেলে দেওয়া।
তাই দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে এবং উমার‌ ঘরে ফেরাকে কেন্দ্র করে দুই হাতে বরণ করে নিল বাঙালি। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে পোশাকি ধর্ম নিয়েই বাঙালি কখনো তৃপ্ত হন নাই।
মন্দিরের ঠাকুর যতদিন পর্যন্ত অন্তরের ঠাকুর হইতে না পারতেন। ততদিন তারা ঠাকুরের উপাসনা না করলে সন্তুষ্ট হতে পারতেন না।
তাই তো‌ কৈলাসবাসিনী– মহীশূরবর্তিনী দুর্গা ও মেনোকা‌ হয়ে‌ গেছেন‌ বাংলার চিরায়িত মা।
উমার ঘরে ফেরার মধ্য দিয়েই একটি ধর্মীয় পৌরাণিক বিষয়। যেভাবে লৌকিক ও মানবিক রূপ রয়েছে।
সেটাই দুর্গোত্সবের প্রাণের স্পন্দন।
এই রূপান্তরের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
বাংলা সাহিত্য ও সংগীত এর বিশেষ একটি ধারা সপ্ত-পদাবলী ।
এবং তার আগমনী ও বিজয়ের গান।
উমা কাহিনী আধুনিক যুগে শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানদের আকৃষ্ট করেছিল তার উদাহরণ, ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা ,ছবিতে আয় বৌমা কোলে লই।
এই গানটির অপূর্ব জনপ্রিয়তা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান।
গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতা হয়ে উঠেছে শহরকেন্দ্রিক।
মানুষ জড়িয়ে পড়েছে এ শহর থেকে অন্য শহরে কিংবা দেশের বাইরে।
পুজোই মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘরে ফেরার টান বা তাৎপর্য হয়তোবা কমেছে।
লন্ডন প্রবাসী মেয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মায়ের সাথে পুজোয় সাক্ষাৎ ভার্চুয়ালি শুধু ভিডিও কলে।
কিন্তু তবুও হঠাৎ ভেসে আসা ছাতিম ফুলের গন্ধ, কেমন যেন উদাস করে দেয়।
সর্বোপরি বাংলার মেয়েদের ‌বহুল অপেক্ষার পালা শান্তির ‌মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকুক দুর্গোৎসব। ধর্ম হোক যার যার উৎসব হোক সবার।

 

লেখাঃ ডা. কলিম

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
জনপ্রিয় সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ